অনলাইন ডেস্ক : আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই। এই আশঙ্কা বাস্তবায়িত হয়ে মঙ্গলবার নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা পর্বে শিলচর জেলা কংগ্রেস কার্যালয় ইন্দিরা ভবনে সৃষ্টি হয় তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির। সোনাইর বিধায়ক আমিনুল হক লস্করের সমর্থক বলে কথিত দলীয় কর্মীদের হাতে
মার খেতে হয় জেলা কংগ্রেসের সংখ্যালঘু বিভাগের চেয়ারম্যান আনসার হোসেন বড়লস্কর ওরফে রিঙ্কুকে। দল বিরোধীতার অভিযোগ এনে আনসারকে মারপিটের জেরে পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজক হয়ে ওঠে যে,খবর পেয়ে ছুটে যেতে হয় পুলিশকেও।তবে পুলিশ অবশ্য কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে নি।অপেক্ষা করছিল গেটের সামনে। মার খাওয়ার পর আনসারকে ভয়ে দরজা বন্ধ করে আবদ্ধ থাকতে হয় কার্যালয়ের একটি কক্ষে। ঘন্টাখানেক পর তার কয়েকজন সঙ্গী পৌঁছে তাকে বন্ধ কক্ষ থেকে ব্যারিকেড করে বাইরে নিয়ে যান। এরপর পুলিশ তাকে দ্রুত একটি গাড়িতে উঠিয়ে সরিয়ে দেয় সেখান থেকে। মারপিটের ঘটনা নিয়ে আনসার সোনাই ব্লক কংগ্রেস সভাপতি নাসিম আহমদ লস্কর সহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করে সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন।
কাছাড়ের ৭ টি বিধানসভা আসনের নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনার জন্য প্রদেশ কংগ্রেস পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে বিধায়ক আমিনুর রশিদ চৌধুরী,প্রাক্তন বিধায়ক স্বপন কর এবং প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রাঞ্জল ঘাটোয়ারকে।
সূচি অনুযায়ী এদিন পর্যালোচনা করা হয় লক্ষীপুর, ধলাই এবং সোনাই আসনের ফলাফল। দুপুর ১২টা নাগাদ ইন্দিরা ভবনের শ্যামাচরণ হলে শুরু হয় পর্যালোচনা পর্ব। প্রথমে লক্ষীপুর এরপর ধলাই-এর ফলাফল পর্যালোচনার পর বিকেল ৪টা নাগাদ শুরু হয় সোনাইয়ের ফলাফল পর্যালোচনা। লক্ষ্মীপুরএবং ধলাইয়ের পর্যালোচনা পর্বে ৩ পর্যবেক্ষকের মধ্যে আমিনুর রশিদ চৌধুরী ছিলেন গরহাজির। সোনাইয়ের পর্যালোচনা শুরুর কিছুক্ষণ পর হাজির হন তিনি। লক্ষীপুর ও ধলাই -এর পর্যালোচনা পর্বে লোকসংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আর পর্যালোচনা পর্বও মিটে যায় শান্তিপূর্ণভাবে। লক্ষ্মীপুর এবং ধলাই থেকে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক নেতা-কর্মী হাজির হলেও সোনাইর ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো চিত্র। ওই বিধানসভা এলাকার প্রচুরসংখ্যক দলীয় নেতা-কর্মী আগে থেকেই হাজির ছিলেন কার্যালয়ে। তাদের উপস্থিতিতে পর্যালোচনা পর্বে শ্যামাচরণ হলের প্রায় সব আসনই ভরে যায়। এদিকে সোনাইর পর্যালোচনা শুরু আগেই কার্যালয়ে হাজির হতে দেখা যায় আনসার হোসেন বড়লস্করকেও।আনসারও সোনাই আসনে দলের টিকিট চেয়েছিলেন। আমিনুলের অনুগামী কংগ্রেসীরা আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিলেন , টিকিট না পেয়ে নির্বাচনের সময় আনসার প্রতিদ্বন্দ্বী অগপ প্রার্থী করিম উদ্দিন বড়ভূঁইয়ার হয়ে প্রকাশ্যে আমিনুলের বিরোধিতা করেছেন। এনিয়ে আগে থেকেই আমিনুলের অনুগামী কংগ্রেসীরা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।
এদিন তাকে কার্যালয়ে হাজির হতে দেখেই শুরু হয়ে যায় কানাঘোষা। তবে শুরুতে কিছু হয়নি। আমিনুল সহ সোনাইর কংগ্রেসীরা পর্যবেক্ষকদের সামনে
নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য শ্যামাচরণ হলে ঢোকার পরও কয়েকজন থেকে যান বাইরে। বন্ধ দরজার বাইরে যখন এরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন পাশেই জেলা কংগ্রেস সভাপতির কক্ষে বসেছিলেন আনসার। তিনি একবার বাইরে বারান্দায় আসতেই
আমিনুল সমর্থক কয়েকজন কংগ্রেসীর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে যায়। নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ অগপ প্রার্থীর হয়ে কাজ করে কেন তিনি কংগ্রেস কার্যালয়ে এসেছেন,এ নিয়ে কয়েকজন প্রশ্ন করলে আনসারও জবাবে কিছু কথা বলেন।এরপরই শুরু হয়ে যায় মারপিট।মার খেয়ে আনসার এক সময় বারান্দায় লুটিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় দলের অন্য দুই কর্মকর্তা রণজিত দেবনাথ ও জাভেদ আখতার লস্কর কোনওক্রমে আনসারকে টেনে নিয়ে কার্যালয়ের বড়বাবুর কক্ষে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তবে উত্তেজিত সোনাইর কয়েকজন কংগ্রেসী এরপরও
দরজা খুলতে ধাক্কা ধাক্কি করতে থাকেন। এই অবস্থায় পর্যবেক্ষক প্রাঞ্জল ঘাটোয়ার সহ আমিনুল হক লস্কররা শ্যামাচরণ হল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে উত্তেজিত কংগ্রেস কর্মীদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সরিয়ে নিয়ে যান। উত্তেজিত কর্মীদের শ্যামাচরণ হলে ঢুকানোর পর ফের শুরু হয় পর্যালোচনা। এভাবে পরিস্থিতি কিছুক্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও
১৫-২০ মিনিট পর ফের আরো কয়েকজন কংগ্রেস কর্মী আনসার দরজা বন্ধ করে বসে থাকা বড় বাবুর কক্ষের দিকে উত্তেজিত হয়ে এগিয়ে যান। তবে এবারও প্রাঞ্জল ঘাটোয়ার ও আমিনুল হক লস্কর সহ অন্য কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে তাদের সরিয়ে নিয়ে যান।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কিছুক্ষণ পর আনসারের কয়েকজন সঙ্গী হাজির হন ইন্দিরা ভবনে। পুলিশও হাজির হয়, পুলিশ পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকে কার্যালয়ের গেটের সামনে। আনসারের সঙ্গীরা তাকে বন্ধ কক্ষ থেকে ডেকে বের করে ব্যারিকেড করে বাইরে নিয়ে যান। বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময়ও আমিনুল সমর্থক সোনাইর এক কংগ্রেস কর্মীর সঙ্গে তার কিছুটা উত্তেজিত বাক্য বিনিময় হয়। তবে অন্যান্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি তখন আর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। আনসারকে তার সঙ্গীরা বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাকে একটি গাড়িতে উঠিয়ে সেখান থেকে দ্রুত সরিয়ে দেয়।
ঘটনা নিয়ে আনসারের বক্তব্য,বিনা প্ররোচনায় আমিনুলের বাহিনীর সোনাইয়ের কিছু লোক তাকে মারপিট করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে তাদের মতো লোকেদের কংগ্রেসে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচনে দল বিরোধীতার অভিযোগ খণ্ডন করে আনসার বলেন, শুধু মুখে বললেই হবে না এর প্রমাণ দিতে হবে। কেউ প্রমাণ দিলে, দল তাকে যে শাস্তি দেবে,তা তিনি মাথা পেতে নেবেন। আনসার এদিন কংগ্রেস কার্যালয়ে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর
ঘটনা নিয়ে সোনাই ব্লক কংগ্রেস সভাপতি নাসিম আহমদ লস্কর সহ অন্য ১১ জন আকিবুজ্জামান লস্কর, আব্দুল জব্বার বড় ভূঁইয়া, চন্দন মজুমদার, আলম হোসেন চৌধুরী, নজমুল হোসেন ওরফে কাবলু, আবুল কাদির মজুমদার, মুজাহিদুল মজুমদার,আনোয়ার শাহাদত মজুমদার, রুবেল আহমদ মজুমদার, শাহীন আহমদ বড়ভূঁইয়া ও মাসুক আহমেদ লস্করের নামে সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন।
এদিকে পর্যালোচনা সভা শেষ হওয়ার পর আমিনুল বলেন,কেউ কাউকে মারপিট করেছে কিনা তা তিনি দেখেন নি। হইচই শুনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। সঙ্গে এও বলেন, এদিন যারা সোনাই থেকে পর্যালোচনা সভায় এসেছিলেন তারা কেউ তার সমর্থক নন, তবে সবাই কংগ্রেস কর্মী। দলে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সমর্থক থাকা উচিত নয়।আমিনুল নাম না করে আনসার প্রসঙ্গে বলেন, উনি যদি জেলা কংগ্রেসের সংখ্যালঘু বিভাগের চেয়ারম্যান হয়ে থাকেন তবে নির্বাচনে জেলায় দলের পক্ষে তার কোনও ভূমিকা দেখা যায়নি কেন। আনসারের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন হাইলাকান্দিতে কংগ্রেস এবং কাছাড়ে অগপ হয়ে যারা কাজ করেন তাদের তো কংগ্রেসে থাকাই উচিত নয়।সংখ্যালঘু বিভাগের চেয়ারম্যান পদ তো অনেক বড় ব্যাপার।
গত শনিবার হাইলাকান্দি জেলা কংগ্রেস কার্যালয়ে তাকে (আমিনুলকে) ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে, এর পেছনেও আনসারের হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত করে বলেন, এদিনও একইভাবে সোনাইর পর্যালোচনা সভা ভেস্তে দেবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তবে সোনাইর কংগ্রেসীরা তা হতে দেননি।





