অনলাইন ডেস্ক : গত সোমবার দুপুরে ঘড়ির কাটায় সময় তখন প্রায় ১টা। শিলচর ইটখলাঘাট দিয়ে এক “হরেক মাল বিক্রেতা ” নদী পার হয়ে ওপারে দুধপাতিলে গিয়েছিলেন সামগ্রী বিক্রির জন্য। নদী পার হয়ে কিছুটা এগোতেই তাকে
পড়তে হয় কিছু সন্দেহাতুর যুবকের প্রশ্নের মুখে। শেষপর্যন্ত আধার কার্ড দেখিয়ে, তার বাড়ির এলাকার লোকেদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলিয়ে তিনি নিষ্কৃতি পান। তবে ওই ফেরিওয়ালার মত মার না খেয়ে নিষ্কৃতি পাবার মত ভাগ্যবান সবাই নন। বর্তমানে
কাছাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে ফেরিওয়ালা থেকে ধরে অপরিচিত লোকেদের অনেককেই পড়তে হচ্ছে মারপিটের মুখে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,এসবের পেছনে রয়েছে এক ভাইরাল ভিডিও। যে ভিডিওয় তুলে ধরা হয়েছে ছেলে ধরা সম্পর্কিত কাহিনী। এই ভিডিও থেকেই জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে নানা গুজব ও আতঙ্কের হাওয়া। যার ফলশ্রুতিতে বেঘোরে মার খেতে হচ্ছে অনেককেই।
গত ৪ মার্চ হোলির দিন ছেলে ধরা সন্দেহে শিলচর ইটখোলাঘাট এলাকায় মার খেতে হয়েছে দুধ পাতিলের দুই মহিলা ও তাদের সঙ্গী এক পুরুষকে।
এর দুদিন পর, উধারবন্দের নগর বাগান এলাকায়ও
একইভাবে মার খেতে হয় এক মহিলাকে। বুধবার ফের এমন ঘটনা ঘটেছে উধারবন্দেরই ঠালিগ্রাম এবং বড়খলার জারইলতলা এলাকায়। জানা গেছে এদিন সকাল ১০টা নাগাদ দুই মহিলা ঠালিগ্রামে
পিকলু কল নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে গিয়েছিলেন। দুই মহিলার একজন অন্ধ্রপ্রদেশের অনয়াডা চেনচেরি এবং অন্যজন তেলেঙ্গানার উবাজি কম্মুগামার বাসিন্দা। স্থানীয়দের অভিযোগ দুই মহিলা পিকলু কলের বাড়িতে ঢুকে একটি শিশুকে চকোলেট দিয়ে ফুসলিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা চালান। তখন তাদের হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়।
এই দুই মহিলাকে পাকড়াও করার পর তাদের এলাকার নাচ ঘরে নিয়ে বেশ মারপিট করে উত্তেজিত জনতা। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে পৌঁছে দুই মহিলাকে উদ্ধারের পর থানায় নিয়ে যায়। দুই মহিলা জানিয়েছেন,তারা এভাবে দেশজুড়ে ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ ও জ্যোতিষচর্চা করেন।ঠালিগ্রামে ওই বাড়িতে চাঁদা সংগ্রহের জন্যই গিয়েছিলেন। তখন তাদের মারপিট করা হয়।।
এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর জারইলতলায় ঘটে যায় এ ধরনের অন্য এক ঘটনা। এলাকায় অচেনা দুই ব্যক্তিকে দেখে স্থানীয় লোকেরা সন্দেহাতুর হয়ে তাদের আটক করেন। সৃষ্টি হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির।খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। আটক দুই ব্যক্তির মধ্যে একজনের নাম দিলীপ সাহু বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনাক্রমকে ঘিরে বাইরে থেকে আসা ফেরিওয়ালা বা অন্যান্য পেশার লোকেরা যারা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আতঙ্কের। মুর্শিদাবাদ থেকে এসে শিলচর ঘনিয়ালায় ঘর ভাড়া নিয়ে “হরেক মাল” ফেরি করা দুই ফেরিওয়ালা জানান, তাদের বেশ কয়েকজনকে ইদানিংকালে এভাবে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে হয়রানীর মুখে পড়তে হয়েছে। তাই কেউ কেউ, ফেরি বাদ দিয়ে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন।
এভাবে জেলায় একের পর এক এমন ঘটনার জেরে সতর্ক হয়ে উঠেছে পুলিশ। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ দমন) রজত কুমার পাল বলেন, সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে যেন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কেউ যেন নিজের হাতে আইন তুলে না নেন। তিনি গুজবে কান না দেবার জন্যও জেলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
প্রসঙ্গত কাছাড়ে গুজবের জেরে গণধোলাইয়ের শিকার হয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বিগত দিনে। এনআরসির নথি চুরি করতে দুষ্কৃতিরা হানা দিচ্ছে গৃহস্থের বাড়িতে,এমন গুজবের জেরে ২০১৯ সালে শিলচর কাঁঠাল রোডে গণপ্রহারে মৃত্যু ঘটে এক যুবকের। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে এর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মহল থেকে।





