অনলাইন ডেস্ক : এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল কাটিগড়ায়। এ ঘটনায় দুই চিকিৎসক সহ মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের লাঠিচার্জেও আহত হয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। এনিয়ে শুক্রবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করে কাটিগড়া চৌরঙ্গীতে। ঘটনাটি এখানকার চৌরঙ্গীস্থিত বেসরকারি নার্সিং হোম সেন্ট্রাল হসপিটালের। মাস কয়েক হয়েছে ওই সেবাকেন্দ্র খোলার। তবে শুরু থেকেই বিতর্ক যেন লেগে আছে। শুক্রবার ঘটে গেছে চরম ঘটনা। অভিযোগ, এদিন সকালে বরইতলি প্রথম খন্ডের আলি হায়দর নামের এক ব্যক্তি তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী রমজানা বেগমকে সেন্ট্রাল হসপিটালে ভর্তি করান। দুপুর দেড়টার সময় রমাজানাকে প্রসব করানোর উদ্দেশ্যে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন ডাঃ সপ্তর্ষি চক্রবর্তী ও ডাঃ তাসনিম সুমাইয়া লস্করের তত্বাবধানে শুরু হয় কাজ। দুই ঘন্টা পর এক নবজাতক এনে আলি হায়দরের কোলে দিয়ে গেলেও রমজানার কোনও খোঁজ মেলেনি। এমতাবস্থায় রোগীর নিকটাত্মীয়রা রমজানার খবর জানতে চাইলে তিনি সুস্থ আছেন বলে জানান ডাঃ তাসনিম। এভাবে আরও ঘন্টা দুয়েক কাটার পর রমজানার স্বজনরা খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেন। তারা লক্ষ্য করেন, হাসপাতালের কর্মী, চিকিৎসক সবাই অস্বাভাবিক দৌড়ঝাঁপ করছেন। এতে সন্দেহ হয়। একসময় তাঁরা জানতে পারেন, রমজানার মৃত্যু হয়ে গেছে। এরপরই ফোনাফোনি শুরু হয়। চলে আসেন আলি হায়দরের আত্মীয় স্বজনরা। হাসপাতালে চড়ায় উত্তেজনা, ওঠে কান্নার রোল। এদিকে, প্রসূতি মৃত্যুর খবর পেয়ে নার্সিং হোমে ছুটে আসে কাটিগড়া পুলিশ। আসেন সার্কল অফিসারও। দলে দলে বাড়তে থাকে সাধারণ মানুষের ভিড়ও। এরইমধ্যে এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে আসতে থাকে আরও অভিযোগ। কেউ চিকিৎসায় গাফিলতির জন্য নিকটাত্মীয় মৃত্যুর অভিযোগ করেন, তো কেউ ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ভুল ফল দেওয়ার অভিযোগ করেন। এনিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় সেন্ট্রাল হসপিটাল এবং নিকটবর্তী ৬ নং জাতীয় সড়কেও। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে একাধিক লোক আহত হওয়ার খবর মিলেছে। এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে শিলচর থেকে ছুটে আসেন কাছাড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুব্রত সেন এবং ডিএসপি (হেডকোয়ার্টার) মহেন্দ্র বরা। সার্কল অফিসার রবাট টোলর এবং কাটিগড়ার ওসি যোশেফ কেইভম সেই শুরু থেকে ছিলেন। সময় আনা হয় কালাইন থানা এবং গুমড়া পিপি থেকে আরও পুলিশ। এক জ্বলজ্যান্ত মানুষের মৃত্যু এভাবে কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। ক্ষুব্দ লোক বারবার দাওয়া করছিলেন হাসপাতালের দিকে। এরইমধ্যে হাসপাতালের রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার ডা: তাসনিম সংবাদমাধ্যমকে জানান, সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। ডেলিভারিও সুন্দর মতো হয়। কিন্তু এরপরই হঠাৎ স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে রোগীর। তড়িঘড়ি লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চালানো হয় আপ্রাণ চেষ্টাও। কিন্তু কিছুই কাজ দেয়নি। ডাঃ তাসনিমের মতে, কার্ডয়াক এরেস্ট হয়েছিল রমজানার। এদিকে, আপনজনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় অবস্থা রমজানার আত্মীয়দের।

স্বামী, মা, দেওররা তো বারেবারে মূর্চ্ছা যাচ্ছিলেন। কানায় ভারি হয়ে গিয়েছিল আস্ত হাসপাতাল চত্বর। এসব দেখে মাথা ঠিক রাখা দায় ছিল অনেকের। তাই ক্ষনে ক্ষনে বিগড়ে যাচ্ছিল পরিস্থিতি। রাত যখন প্রায় ১০টা তখন কঠোর হয় কাটিগড়া পুলিশ। এর আগে সার্কল বা পুলিশ প্রশাসন থেকে বারবার নার্সিং হোমের মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, মালিক পক্ষ কার্যত কোনও সহযোগিতা করেনি। তাছাড়া রমজানার স্বামীর দেওয়া এজহারের ভিত্তিতে কাটিগড়া পুলিশ দুই চিকিৎসক সমেত মোট পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া দুই চিকিৎসক হলেন ডাঃ তাসনিম সুমাইয়া লস্কর এবং ডাঃ জেবি দেওরি। দেওরি সরকারি চিকিৎসক। এদের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছেন হাসপাতালের তিন কর্মীও। এদিকে, রাত অনেক হলেও হাসপাতাল চত্বর এবং জাতীয় সড়ক ভর্তি ছিলেন ক্ষুব্দ জনতায়। তারা হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকেন। পরে এই পাঁচজনকে গ্রেফতারের কথা জনসমক্ষে ঘোষণা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন সার্কল অফিসার। তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন, সব দিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে সিল করে দেওয়া হবে সেন্ট্রাল হসপিটাল। একইসঙ্গে শনিবার মৃত রমজানার ময়নাতদন্ত হবে বলে জানা গেছে। তাছাড়া দুই চিকিৎসক সহ অন্যদেরকে রাতে কাটিগড়া থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।





